আমি জ্যোতিষী নই, তাই নিশ্চিত করে বলতে পারি না আগামীকাল বা এক বছর পরে কী ঘটবে। আমাদের দেশ, সমাজ কিংবা জীবন—কোনোটাই সরল পথে চলে না। প্রতিটি পথেই আছে বাঁক, অনিশ্চয়তা ও হঠাৎ ছন্দপতনের আশঙ্কা। তবু অভিজ্ঞতা ও যুক্তির ভিত্তিতে আমরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা করার চেষ্টা করি এবং প্রস্তুতি নিই। কিন্তু সেই প্রস্তুতি যদি সম্মিলিত না হয়, যদি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো একসঙ্গে সতর্ক না থাকে, তাহলে ব্যক্তিগত অনুমান কোনো কাজে আসে না—এ বাস্তবতা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো।
যা আমরা চাই না, যা প্রত্যাশিত নয়—তাকে বলা হয় অঘটন। এমন কিছু ঘটলে আমরা বিস্মিত হই, হতাশ হই। কিন্তু অঘটন কখনোই আপনা–আপনি ঘটে না। এর পেছনে থাকে পরিকল্পনা, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত উদ্যোগ। উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত রেখে আঘাত হানা। সামরিক ভাষায় একে বলা যায় ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’—এক ধরনের হুঁশিয়ারি, ভয় দেখানো এবং শক্তি প্রদর্শন।
সম্প্রতি দুটি জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা ও দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর হামলা হয়েছে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ঘৃণার প্রচার চলছিল। অনেকেই জানতেন, কিছু গোষ্ঠী এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ দেখতে চায়। কিন্তু প্রকাশ্য হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ হবে—তা অনেকের কল্পনার বাইরে ছিল।
এ দেশে প্রায়ই দেখা যায়, একদল মানুষ নিজ উদ্যোগে কাউকে শত্রু বানায়, নিজেরাই বিচার করে এবং সঙ্গে সঙ্গে সেই ‘রায়’ কার্যকর করে ফেলে। একে কেউ কেউ ‘মব জাস্টিস’ বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। বাস্তবে এটি ন্যায়বিচার নয়, এটি সহিংসতা। এর পেছনে থাকে ভিন্নমত দমন, ভয় সৃষ্টি এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্য।
বিচারব্যবস্থা যখন ধীর, ব্যয়বহুল ও মানুষের নাগালের বাইরে থাকে, তখন অনেকেই আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। বছরের পর বছর বিচার না পাওয়া, আদালত ও আইনজীবীর খরচ বহন করতে না পারা—এসব থেকেই জন্ম নেয় ক্ষোভ ও সহিংসতা। আইনের শাসন কার্যকর না হলে মব জাস্টিস বন্ধ করা সম্ভব নয়।
এর পাশাপাশি রয়েছে আরেকটি গভীর সমস্যা—আমাদের সমাজের পশ্চাৎপদ মানসিকতা। আমরা এখনো অনেকাংশে মধ্যযুগীয়, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক বা ‘ট্রাইবাল’ সংস্কৃতিতে বাস করছি। ভিন্ন মত মানেই শত্রু। প্রতিটি গোষ্ঠী নিজেকে একমাত্র সঠিক মনে করে, আর অন্যদের দমন করাকে ন্যায্য দায়িত্ব বলে মনে করে। নেতা এখানে কেবল নেতা নন, তিনি ‘ত্রাতা’। তাঁর নির্দেশেই আগুন জ্বলে ওঠে।
রাজনৈতিক স্লোগান, বক্তৃতা ও ভাষায়ও সেই মধ্যযুগীয় নিষ্ঠুরতার প্রতিফলন দেখা যায়—চোখের বদলে চোখ, জানের বদলে জান। এসব স্লোগান সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ দেয় না; এগুলো শোনা যায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কিংবা রাজনৈতিক সমাবেশে। উত্তেজক ভাষা, হুমকি আর সহিংসতার ডাক—যে যত বেশি দেয়, তার জনপ্রিয়তা নাকি তত বাড়ে।
সংস্কৃতি, গান বা মতপ্রকাশ পছন্দ না হলেই তাকে ইসলামবিরোধী বা দেশবিরোধী আখ্যা দিয়ে হামলা চালানো হয়। বাড়িঘর, প্রতিষ্ঠান, বাদ্যযন্ত্র লুট হয়, আগুন দেওয়া হয়। সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। পাঠকের রায়ে যে পত্রিকা জনপ্রিয়, তাকেই জনগণের শত্রু বলা হয়। অথচ যাদের নামে ‘জনগণ’-এর কথা বলা হয়, তাদের বড় অংশ পত্রিকাই পড়ে না।
এই হামলার সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজের চোর-ছেঁচড়ে-লুটেরা। তারা সুযোগ নেয়, সম্পদ লুট করে, তারপর আগুন জ্বালায়। আর কেউ কেউ বুদ্ধিবৃত্তিক কসরত করে বলেন, এরা মব নয়—এরা ‘প্রেশার গ্রুপ’। সহিংসতা ও লুটপাটকে বৈধতা দেওয়ার এমন চেষ্টা ভয়ংকর ইঙ্গিত দেয়।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন একটাই—আমরা কি আবার মধ্যযুগীয় বর্বরতার দিকে ফিরে যাচ্ছি? যদি এখনই সম্মিলিতভাবে রুখে না দাঁড়াই, তবে পরের আগুন হয়তো শুধু সংবাদমাধ্যম বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে থামবে না।
